Return & Zero-Return
রিটার্ন ও শূন্য রিটার্ন
রিটার্ন কি
আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬৫ তে রিটার্ন সম্পর্কে বলা হয়েছে। তবে উক্ত ধারায় রিটার্নের কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত যে ফরমে করদাতাগণ আয়কর বিবরণী দাখিল করেন, তাকেই রিটার্ন বা আয়কর রিটার্ন বলা হয়েছে। ব্যবসা, হিসাববিজ্ঞান বা কর সংক্রান্ত বিষয়ে রিটার্ন বিবরণী অর্থে ব্যবহৃত হয়।
কার কার জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক (ধারা ১৬৬)
(ক) আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে
(খ) পূর্ববর্তী ৩ বছরের মধ্যে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে
(গ) কোম্পানি, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী, ফার্ম, ফার্মের অংশীদার, ব্যক্তিসংঘ, নির্বাহী, ব্যবস্থাপক, সরকারি কর্মচারী, অনিবাসী
(ঘ) কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত করদাতা (৬ষ্ঠ তফসিল, অংশ-১
(ঙ) হ্রাসকৃত করহারপ্রাপ্ত করদাতা
(চ) টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক এমন ব্যক্তি (ধারা ২৬১)
(ছ) রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিলে বাধ্য এমন ব্যক্তি (ধারা ২৬৪)
কোন সত্তার (ব্যক্তিক ও অব্যক্তিক) সাধারণত করযোগ্য আয় থাকলে রিটার্ন দাখিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। করযোগ্য আয় না থাকা সত্ত্বেও কতিপয় আইনী বাধ্যবাধকতা পরিপালনের জন্য অনেক সত্তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬৬ তে কোন কোন সত্তা রিটার্ন দাখিল করবে তা বিবৃত করা হয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ২(৮০ক) এ কোন শ্রেণির করদাতা কখন রিটার্ন দাখিল করবে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
রিটার্নের সাথে কি কি দলিল দাখিল করতে হবে (ব্যক্তি করদাতা)
অনলাইন রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কোন প্রমাণক দাখিলের সুযোগ নেই। তবে রিটার্নটি নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলে প্রয়োজনীয় প্রমাণক দাখিল করতে হবে। সেহেতু রিটার্ন প্রস্তুতির সময় সকল প্রমাণক সংরক্ষণ করলে পরবর্তীতে প্রয়োজনের সময় দাখিল করা সহজতর হবে। আয় ভেদে নিম্নবর্ণিত প্রমাণক সংরক্ষণে রাখা আবশ্যক:
(১) চাকরি হতে আয়
(ক) বেতন বিবরণী (বাধ্যতামূলক)
(খ) ব্যাংক বিবরণী (বাধ্যতামূলক)
(২) ভাড়া হতে আয়
(ক) ভাড়ার চুক্তিপত্র (যদি থাকে)
(খ) ব্যাংক বিবরণী (মাসিক ভাড়া প্রাপ্তি ২৫,০০০ টাকার উপরে হলে বাধ্যতামূলক)
(৩) কৃষি হতে আয়
(ক)
(খ)
(৪) ব্যবসা হতে আয়
(ক) ক্রয়-বিক্রয় হিসাব
(খ) লাভ-ক্ষতি হিসাব
(গ) স্থিতিপত্র
(ঘ) ব্যাংক বিবরণী
(ঙ) ঋণের বিবরণী
(চ) অন্যান্য দায়ের স্বপক্ষে প্রমাণ
(৫) মূলধনি আয়
(ক) মূলধনি সম্পত্তি বিক্রয়ের দলিল
(খ) মূলধনি মুনাফার উপর কর পরিশোধের প্রমাণ
(গ) হস্তান্তরিত সম্পত্তি অর্জনের প্রমাণ (প্রযোজ্য হলে)
(৬) আর্থিক পরিসম্পদ হতে আয়
(ক) ব্যাংক সুদ প্রাপ্তির প্রত্যয়ন (যদি থাকে)
(খ) লভ্যাংশ প্রাপ্তির প্রত্যয়ন (যদি থাকে)
(গ) সঞ্চয়পত্রের বিবরণী (যদি থাকে)
(ঘ)
(৭) অন্যান্য উৎসের আয়
(ক) আয় থাকলে তার প্রমাণ, যেমন- সম্মানী থাকলে তার প্রত্যয়ন
ব্যক্তি করদাতার অন্যান্য যেসব প্রমাণ দাখিল করতে হবে
(ক) উৎসে কর্তিত করের প্রমাণ
(খ) বিনিয়োগ থাকলে তার প্রমাণ (রেয়াতের জন্য)
(গ) সম্পত্তি ক্রয়ে বিনিয়োগ থাকলে প্রমাণ
(ঘ) অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ
শূন্য রিটার্ন
ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ার পর 'শূন্য রিটার্ন' বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২০২৪-২৫ করবর্ষে সরকারি চাকরিজীবীসহ কতিপয় করদাতার রিটার্ন অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন অনেক করদাতা বিভিন্ন কমপিউটারের দোকান থেকে অনলাইনে রিটার্নের সব কলামে শূন্য দিয়ে পূরণ করে জমা দিয়েছেন মর্মে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর প্রেক্ষিতে জাতীয় রজাস্ব বোর্ডও সংবাদ বিজ্ঞাপ্তি দিয়ে আয়কর আইনে শূন্য রিটার্ন বলে কিছু নেই মর্মে করদাতাদের অবহিত করেন।
আয়কর আইন পর্যালোচনায় রিটার্ন দাখিলের বিধান রয়েছে। আয়কর রিটার্ন বিধিমালায় কোন শ্রেণির করদাতা কোন ধরণের রিটার্ন দাখিল করেছেন তা উল্লেখ রয়েছে। করদাতা তার রিটার্নে সঠিক তথ্য প্রদান করবেন এটাই আইন। ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর রিটার্ন আয় ও করের বিবরণী (আইটি-১১গ), জীবনযাত্রার খরচের বিবরণী (আইটি-১০বিবি) এবং সম্পদ ও দায়ের বিবরণী (আইটি-১০বি) এর সমন্বয়ে গঠিত (ধারা ১৬৬)।
একজন করদাতার আয় যদি করমুক্ত সীমার মধ্যে আয় থাকে, তাহলে কর শূন্য হবে এবং কর সংক্রান্ত ঘরগুলি শূন্য হবে। এটা অনেক করদাতারই হতে পারে।
করদাতার যদি আয় না থাকে তাহলে রিটার্নে আয়ের ঘরগুলোও শূন্য হতে পারে। তাহলে আয়কর রিটার্নের আয় ও করের অংশে শূন্য হতে পারে।
আয়কর রিটার্নের জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশে শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। একজন করদাতার ব্যয় থাকাই স্বাভাবিক। ব্যয় ছাড়া একজনের জীবনযাত্রা নির্বাহ করা অসম্ভব। সেহেতু জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত ছক (আইটি-১০বিবি) শূন্য হওয়া অস্বাভাবিক। তবে পিতামাতার উপর নির্ভরশীল হলে জীবনযাত্রার ব্যয় শূন্য হতে পারে, এক্ষেত্রে পিতা-মাতার রিটার্নে সকল খরচ প্রদর্শিত থাকতে হবে। এছাড়া যদি এমন হয় যে, পিতা-মাতা সন্তানদের উপর নির্ভরশীল, তাহলে সন্তানের নথিতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ বাবদ ব্যয় প্রদর্শন করতে হবে। তাহলে পিতা বা মাাতা তাদের আয়কর রিটার্নের জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত ছক শূন্য দ্বারা পূরণ করতে পারেন, অর্থৎ জীবনযাত্রার ছক শূন্য হতে পারে।
এবার আসি সম্পদ ও দায় বিবরণীতে। একটি সম্পদ ও দায় বিবরণীতে (আইটি-১০বি) তে একজন করদাতার সকল সম্পদের বিস্তারিত থাকে, সকল দায়ের বিস্তরিত থাকে ও ব্যয়ের সংক্ষিপ্তসার থাকে। পূর্বেই আলোচনা করেছি একজন করদাতার ব্যয় না থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে ব্যয়ের অংশটি শূন্য হতে পারে। করদাতার কোন দায়ও না থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে দায়ের অংশটিও শূন্য হতে পারে। তবে সম্পদের অংশটি শূন্য হওয়া অস্বাভাবিক। একজন করদাতার কোন সম্পদ নেই এটা সাধারণত হয়না। যাদের কোন আয় নেই, ব্যয় নেই, সম্পদ নেই তাদের তো টিআইএনই নেই। ফলে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের কোন বিষয় নেই। সাধারণত সম্পদ অর্জনের জন্য মানুষ টিআইএন গ্রহণ করে থাকে। নিজের অর্জিত সম্পদ না থাকলেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ থাকে। ফলে সম্পদ বিবরণী শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই। তারপরেও, যদি ছাত্র হয়, পিতা-মাতার উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এমন কিছু ক্ষেত্রে তাদের নিজ নামে সম্পদ নাও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে একজন করদাতার রিটার্নে সম্পদের অংশও শূন্য হতে পারে। এছাড়া একজন করদাতার সম্পদ বিবরণী শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ছাত্র, বেকার, ভবঘুরে ব্যতীত একজন করদাতার আয়কর রিটার্নের সব অংশ শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই। আয়কর আইনেও শূন্য রিটার্ন বলে কিছু নেই। একজন করদাতার অপ্রযোজ্য কলামসমূহ শূন্য হতে পারে, তাতে পুরো রিটার্নই শূন্য হয়ে যায় না। তাই সকলকে আহবান জানাবো শূন্য রিটার্নে বিভ্রান্ত হবে না, আপনার সঠিক তথ্য দিয়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করুন যা আপনাকে পরবর্তীতে অযাচিত সমস্যা হতে রক্ষা করবে।